মেনু নির্বাচন করুন

মল্লিকার দীঘি

মল্লিকার দিঘীটি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলাধীন শশীদল ইউনিয়নের মল্লিকার দিঘী নামে গ্রামে অবস্থিত। এর আয়তন প্রায় ৫.২৭ একর। জানা যায়, এ দিঘীটি প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে খনন করা হয়। এ দিঘীটি সরকারের খাস হিসেবে আছে। এর সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। এক পক্ষে ছিল পাকিস্তানি বাহিনী। অন্যপক্ষ ছিল গোটা বাঙালি জাতি। হ্যাঁ, গোটা জাতিই যোদ্ধা হয়ে গিয়েছিল একাত্তরে। কেউ সরাসরি অংশ নিয়েছে, প্রশিক্ষণ নিয়েছে যুদ্ধের। কেউবা একবারে প্রশিক্ষণ ছাড়াই লড়াইয়ের মাঠে নেমেছিল। দা, কুড়াল, খুন্তি, শাবল এমনি সাধারণ অস্ত্র দিয়েও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তারা। এমন যোদ্ধাদের অধিকাংশই শহীদ হয়েছেন। এমনি এক যোদ্ধার কথা বলছি। তেমনি এক বীরের নাম মফিজউদ্দিন মেম্বার। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মল্লিকার দীঘি গ্রামের অধিবাসী ছিলেন তিনি। 
মফিজউদ্দিন ছিলেন শষিদল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি মনে করেছিলেন তাঁর মতো প্রবীণ মানুষদের হয়তো পাকিস্তানি বাহিনী কোনো ক্ষতি করবে না। তারপরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়েছিলেন নাগাইশ গ্রামের আলী আহাম্মদ ও উত্তর শষিদল গ্রামের ফজলুর রহমান এর কাছে। তারা দুজনই ছিল রাজাকার। অনুরোধ করেছিলেন, মফিজউদ্দিন মেম্বারদের যেন কোনো ক্ষতি করা না হয়। 
কিন্তু চারিদিকে একসময় অস্বাভাবিক অত্যাচার বেড়ে যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি সহযোগিতা করতে থাকে স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা। বিভিন্ন গৃহস্থ বাড়িতে গিয়ে হাঁস মুরগী, গরু-ছাগল যা সামনে পায় তাই নিয়ে যায়। 
খালি ঘর ছিল প্রতিটি বাড়িতে। সেসব ঘরে ঢুকে ধানচাল যা পায় তাই নিয়ে যায়। সুযোগ পেলে মানুষও মেরে আসে- সামনে পেলে। শ্রাবণ মাসের শেষার্ধে আলী আহাম্মদদের সহযোগিতায় নাগাইশ গ্রামের বাজারে ১৫জন মানুষকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। ফলে উদ্বেগ বেড়ে যায় মফিজউদ্দিনদের। 
শেষ চেষ্টা হিসেবে আবারো মফিজউদ্দিন গেলেন আলী আহাম্মদ ও ফজলুর রহমানের কাছে। বললেন, তারা তো আর মুক্তিবাহিনী নন। সুতরাং তাদের ওপর যেন অত্যাচার না করা হয়। এমনকি তারা তো দেশও ছাড়েননি। মনে করিয়ে দেন আলী আহাম্মদই বলেছিলেন,তাঁরা যেন বাড়ি না ছাড়েন। হিন্দুস্থানে যারা গেছে তাদেরও যেন ফিরিয়ে আনেন। আলী আহাম্মদের কথা অনুযায়ী তিনি দেশে থেকে গেছেন সেটাও জানালেন তাকে। 
কিন্তু রাজাকারদের বিশ্বাস করা যায় না। পরিবারের লোকজন পরামর্শ করলেন। বললেন যুবক ও মহিলাদের বাড়ি থেকে সরিয়ে দিতে হবে। বুড়ো মানুষরা থাকবে বাড়িতে। তাই বাড়ির এক অংশে তিনি সস্ত্রীক রইলেন। অন্য অংশেও তারই মতো অধিকাংশ সদস্যকে সরিয়ে দিয়ে দ’ুয়েকজন করে থেকে যান। 
ভাদ্র মাসের ৬ তারিখ ছিল সেদিন। মফিজউদ্দিন সকাল বেলা নামাজ শেষে কোরান তেলাওয়াত করলেন। সকাল ৭টা বাজে হয়তো। সকালের খাবার খাওয়ার জন্য বসেছেন ঘরে। খাওয়াও শুরু করেছেন তিনি। এমন সময় আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলেটি দৌড়ে এল মফিজউদ্দিনের ঘরে। বলল, আব্দুর রাজ্জাকের ঘরে পাকিস্তানি বাহিনীর এক সদস্য এসেছে। রাজ্জাক মিয়ার ঘরের মহিলারা তখন নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়ে যায়। এদিকে পাকিস্তানি একটি সৈনিক অসভ্য আচরণ করতে চাইছে। 
মফিজউদ্দিন বয়সে প্রবীণ হলেও মনেপ্রাণে ছিলেন প্রচ- তেজি। কোনো অত্যাচার সহ্য করতে পারতেন না। ক্ষেপে গেলেন মফিজউদ্দিন। একবারও তাঁর মনে হলো না তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন। কোনো অস্ত্র নেই তাঁর। আর পাকিস্তানি সৈন্যর হাতে আধুনিক অস্ত্র থাকার কথা। এমন অবস্থায় আর্মির মুখোমুখি হওয়া মানে হতে পারে নিজের জীবনটা হারানো। 
এদিকে ওদিক তাকালেন ঘরের ভিতর। খুঁজছিলেন রাম-দাটা। কিছুদিন আগে এটা বানিয়ে এনেছিলেন চোর-ডাকাতের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য। রাম-দা হাতে দেখে স্ত্রী দ্রুত এসে স্বামীকে বাধা দিলেন। অনুরোধ করলেন, ওদের সামনে যেন তিনি না যান। কিন্তু মফিজউদ্দিন স্ত্রীর বাধা শুনলেন না। তাঁর কথা তাঁর জীবদ্দশায় কোনো মেয়ে মানুষের গায়ে হাত দিলে তার বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। আল্লাহর কাছে তিনি কি জবাব দেবেন। 
তিনি মনে করলেন, এটাই তার জন্য জিহাদ। আল্লাহকে স্মরণ করে রওনা হলেন দক্ষিণ হিস্যায় আব্দুর রাজ্জাকের ঘরের দিকে। গিয়ে দেখেন একজন আর্মি। তাও নিরস্ত্র। নিরস্ত্র দেখে তার সাহস বেড়ে যায়। কিন্তু তারপরও সাবধানতার বিকল্প নেই। তিনি অতি সতর্কতার সাথে এগিয়ে যেতে থাকেন আর্মির দিকে। যাতে সে না বুঝতে পারে যে, তার দিকে কেউ এগিয়ে আসছে। কিন্তু ৪০/৫০ ফুট যাওয়ার পর আর তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। ইয়া আলী বলে এত জোরে দৌড় দিলেন যে, মনে হচ্ছিল তিনি বুঝি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। 
পাকিস্তানি সৈন্যটা তখনো বুঝে ওঠতে পারেনি আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। মোড় ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আর্মির ঘাড় বরাবর রামদার একটি কুপ গিয়ে পড়ে। মফিজউদ্দিন মরণ পণ করেই এসেছিলেন। ফলে তার শরীরে যত শক্তি আছে তার পুরোটাই প্রয়োগ হলো সেখানে। কুপ খেয়ে সৈনিকটিও চিৎকার করে ওঠে। 
এই চিৎকারের কারণেই পরের ঘটনার সূত্রপাত হয়। বাড়ির সামনে ছিল আরো কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। চিৎকার শুনে তারাও বাড়ির ভিতরে চলে আসে। দেখে তাদের সহযোদ্ধা পড়ে আছে উঠানে। আর রামদা হাতে মফিজউদ্দিন পালানোর চেষ্টা করছে। একটা সৈন্য অত্যন্ত ক্ষীপ্ত হয়ে গুলি করে মফিজউদ্দিনকে লক্ষ্য করে। এত কাছে যে লক্ষ্য ভেদ হওয়ার কোনো কারণই নেই। নিজ বাড়ির উঠানেই লুটিয়ে পড়েন মফিজউদ্দিন। 
অদূরেই একটি ঘরের ভিতরে বসে বসে দেখছিলেন এই দৃশ্য মফিজউদ্দিনেরই ভাইয়ের ছেলে রজ্জব আলী। তিনি সহ্য করতে পারলেন না নিজের চাচার এই পরিণতি। চিৎকার করে এগিয়ে এলেন চাচার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে রজ্জব আলীকেও গুলি করে হানাদার বাহিনীর এক সদস্য। সেখানেই তিনি পড়ে যান। দুজনেরই মৃত্যু হয় অল্প সময়ের মধ্যে। 
ঘটনার প্রাক্কালে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন মফিজউদ্দিন মেম্বারের ছেলে আব্দুল মতিন । পালিয়ে থেকেই খবর জানতে পারেন যে তাঁর বাবা ও চাচাতো ভাইকে পাকিস্তানিবাহিনী হত্যা করেছে। সাড়ে ৭টা অথবা ৮টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের সহযোদ্ধার মৃতদেহ নিয়ে চলে গেছে। 
আব্দুল মতিন মেম্বার মনে করলেন অতি দ্রুত মৃতদেহগুলোর সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি চলে আসেন বাড়িতে। 
নিজের বাবার লাশ নিয়ে যান পশ্চিম দিকের এক গ্রাম বড়ধুশিয়ায়। সেখানে বড় মসজিদের সামনে তাকে দাফন করেন। সেখানে ছিল মফিজউদ্দিনের মেয়ের জামাইর বাড়ি। তারপর জব্বার এর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় চান্দলা গ্রামে। চান্দলা গ্রামের রামচন্দ্রপুর পাড়ার সাহেব আলী পুলিশের বাড়িতে নিয়ে তার লাশ দাফন করা হয়। ( একাত্তরে একই বাড়ির ওয়াজিউদ্দিনকেও হানাদার বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।বাড়িটি আগুণে পুড়িয়ে দিয়েছিল। তথ্য: আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবু তাহের, অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শশিদল আবু তাহের কলেজ


Share with :

Facebook Twitter